সংক্ষেপে: বাংলাদেশের সফল উদ্যোক্তা বলতে একটি নির্দিষ্ট ‘সেরা ২০’ তালিকা বোঝায় না। এখানে ছয়জন প্রতিষ্ঠাতার উদ্যোগ দেখানো হয়েছে—স্যামসন এইচ চৌধুরীর স্কয়ার, কামাল কাদিরের বিকাশ, ফাহিম মাশরুরের বিডিজবস, আফিফ জামানের শপআপ, স্যার ফজলে হাসান আবেদের ব্র্যাক ও রুনা খানের ফ্রেন্ডশিপ। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রকাশিত তথ্য দিয়ে পরিচয় ও উদ্যোগ মিলিয়ে দেখা হয়েছে; ব্যবসায়িক ও সামাজিক উদ্যোগকে আলাদা করে বোঝানো হয়েছে।
‘সফল’ শব্দটি এখানে ব্যক্তিগত সম্পদ, মুনাফা বা জনপ্রিয়তার র্যাঙ্কিং নয়। প্রতিষ্ঠিত উদ্যোগের মাধ্যমে দীর্ঘদিন একটি নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধানের উদাহরণ বোঝাতে ব্যবহার করেছি। প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইট তাদের নিজেদের কাজের বিবরণ দেয়; পাঠকের উচিত কোনো বিনিয়োগ বা ক্যারিয়ার সিদ্ধান্তের আগে স্বাধীনভাবে যাচাই করা।
এক নজরে ছয়টি উদ্যোগ
- স্যামসন এইচ চৌধুরী — স্কয়ার: পাবনার ছোট ফার্মেসি থেকে ওষুধ উৎপাদনের উদ্যোগ।
- কামাল কাদির — বিকাশ: মোবাইলের মাধ্যমে আর্থিক সেবা সহজ করার উদ্যোগ।
- ফাহিম মাশরুর — বিডিজবস: চাকরির বিজ্ঞাপন ও আবেদনকে অনলাইনে আনার উদ্যোগ।
- আফিফ জামান — শপআপ: ছোট দোকানের পণ্য সংগ্রহ ও সরবরাহের সমস্যা নিয়ে কাজ।
- স্যার ফজলে হাসান আবেদ — ব্র্যাক: পুনর্বাসন থেকে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উন্নয়নের উদ্যোগ।
- রুনা খান — ফ্রেন্ডশিপ: চর ও দূরবর্তী জনগোষ্ঠীর জন্য নৌভিত্তিক সেবা দিয়ে শুরু।
ব্যবসায়িক উদ্যোক্তা: চারটি যাচাই করা উদাহরণ
১. স্যামসন এইচ চৌধুরী: স্কয়ার
স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের জীবনী অনুযায়ী স্যামসন এইচ চৌধুরী ১৯৫২ সালে পাবনার আতাইকুলায় একটি ফার্মেসি শুরু করেন। ১৯৫৮ সালে তিন বন্ধুর সঙ্গে অংশীদারিতে ওষুধ কোম্পানি গড়েন। তাই এই গল্পকে ‘একাই বড় কোম্পানি বানিয়েছেন’ বলা সঠিক নয়; অংশীদারিত্ব তাঁর শুরুর অংশ ছিল।
শেখার বিষয়: ছোট পরিসরে বাজার ও কাজ বোঝার পর অন্যদের সঙ্গে দক্ষতা ও দায়িত্ব ভাগ করে উৎপাদনে যাওয়া একটি সম্ভাব্য পথ। কিন্তু ওষুধ খাতের অনুমোদন, মান নিয়ন্ত্রণ ও পুঁজি সব সময় আলাদা করে বিবেচনা করতে হয়; এই উদাহরণ দেখে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ওষুধের ব্যবসা শুরু করা যায় না।
২. কামাল কাদির: বিকাশ
বিকাশের নিজস্ব প্রকাশনায় কামাল কাদিরকে প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে তাঁর উদ্যোগের কেন্দ্রীয় সমস্যা ছিল প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের বাইরে থাকা মানুষের দৈনন্দিন লেনদেন। প্রতিষ্ঠানটি মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবা ও এজেন্ট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সেই প্রয়োজন পূরণের চেষ্টা করেছে।
শেখার বিষয়: প্রযুক্তি তখনই মূল্য তৈরি করে, যখন সেটি মানুষের বিদ্যমান একটি কাজ সহজ করে এবং ব্যবহারের বাস্তব পথ থাকে। বিকাশের উদাহরণে অ্যাপের পাশাপাশি এজেন্টের বিষয়টি তাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আর্থিক সেবা নিয়ন্ত্রিত খাত; অনুমতি, নিরাপত্তা ও গ্রাহক সুরক্ষা ছাড়া একই মডেল নকল করা যায় না।
৩. ফাহিম মাশরুর: বিডিজবস
বিডিজবসের নিজস্ব পরিচিতিতে ফাহিম মাশরুরকে সহপ্রতিষ্ঠাতা বলা হয়েছে এবং কয়েক বন্ধুর সঙ্গে ২০০০ সালে উদ্যোগ শুরুর কথা আছে। বিডিজবসের বর্তমান পরিচিতি পাতায় তাঁকে প্রধান নির্বাহী হিসেবে দেখানো হয়েছে। এটি চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগকর্তাকে এক ডিজিটাল জায়গায় আনার উদাহরণ।
শেখার বিষয়: একটি বাজারে দুই পক্ষ থাকলে শুধু ওয়েবসাইট তৈরি যথেষ্ট নয়—দুই পক্ষই যেন ব্যবহার করতে পারে, তথ্য হালনাগাদ থাকে এবং আবেদনপ্রক্রিয়া পরিষ্কার হয়। নতুন উদ্যোক্তা নিজের খাতে এমন দুই-পক্ষীয় সমস্যা আছে কি না, তা আগে খুঁজতে পারেন।
৪. আফিফ জামান: শপআপ
শপআপের ‘About’ পাতায় আফিফ জামানকে প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেই বিবরণে ছোট ব্যবসার পণ্য সংগ্রহ, সরবরাহ ও অর্থায়নের বাধাগুলো উদ্যোগটির শুরুর প্রেক্ষাপট হিসেবে এসেছে। শপআপ ছোট দোকান ও সরবরাহকারীদের মধ্যে সংযোগ তৈরির কাজ করে।
শেখার বিষয়: দোকানদারের সামনে দেখা সমস্যাটি শুধু ‘আরও পণ্য’ নয়; সঠিক সময়ে পণ্য পৌঁছানো ও সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নতুন B2B ধারণা পরীক্ষা করতে হলে আগে দোকানদারের প্রকৃত কাজের ধাপ দেখে সমস্যা লিখে নেওয়া ভালো।
সামাজিক উদ্যোক্তা: দুইটি আলাদা ধরনের উদ্যোগ
সামাজিক উদ্যোগের উদ্দেশ্য ও সাফল্যের মাপকাঠি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মতো সব সময় মুনাফা নয়। এখানে সেবার প্রয়োজন, পৌঁছানোর পদ্ধতি এবং ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই প্রতিষ্ঠাতাকে ব্যবসায়িক সম্পদের তালিকায় মেশানো হয়নি।
৫. স্যার ফজলে হাসান আবেদ: ব্র্যাক
ব্র্যাকের ইতিহাস অনুযায়ী ১৯৭২ সালে স্যার ফজলে হাসান আবেদের নেতৃত্বে যুদ্ধ-পরবর্তী ত্রাণ ও পুনর্বাসন কাজ থেকে ব্র্যাকের শুরু। পরে সংগঠনটি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কাজের দিকে যায়। এটি দেখায় যে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে শুরু করা একটি উদ্যোগ সময়ের সঙ্গে নতুন সমস্যা অনুযায়ী কাজের ধরন বদলাতে পারে।
শেখার বিষয়: আগে সমস্যার কাছে যেতে হয়, তারপর কার্যক্রমের পদ্ধতি ঠিক করতে হয়। তবে ব্র্যাকের বড় আকারকে নতুন কোনো সামাজিক উদ্যোগের প্রথম বছরের বাস্তবসম্মত লক্ষ্য ভাবা ভুল হবে; স্থানীয়ভাবে কার্যকারিতা যাচাই করাই প্রথম ধাপ।
৬. রুনা খান: ফ্রেন্ডশিপ
ফ্রেন্ডশিপের প্রতিষ্ঠাতার পরিচিতি জানায়, রুনা খান ২০০২ সালে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং শুরুতে একটি ভাসমান হাসপাতাল ছিল। চর ও দূরবর্তী জনগোষ্ঠীর কাছে সেবা পৌঁছানোর সমস্যা থেকে এই নৌভিত্তিক পদ্ধতির গুরুত্ব বোঝা যায়। প্রতিষ্ঠানটির কাজ পরে স্বাস্থ্যসেবার বাইরেও বিস্তৃত হয়েছে।
শেখার বিষয়: সেবা পৌঁছানোর পথও উদ্ভাবনের অংশ। গ্রাহক বা উপকারভোগী যেখানে আছেন, সেখানে পৌঁছাতে না পারলে ভালো সেবাও কাজে আসে না। কোনো এলাকার ভৌগোলিক বাধা বুঝে তার উপযোগী সেবা-পদ্ধতি পরীক্ষা করা দরকার।
এই ছয়জনের গল্প থেকে নিজের উদ্যোগের জন্য কী নেবেন?
- সমস্যা নির্দিষ্ট করুন: ‘সবাইকে সাহায্য করব’ বলার বদলে কার কোন কাজ আটকে আছে তা লিখুন।
- ব্যবহারকারীর পথে যান: দোকান, মোবাইল লেনদেন, চাকরির আবেদন কিংবা নৌপথ—প্রতিটি উদাহরণে ব্যবহারের বাস্তব পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ।
- অংশীদারিত্ব ও নিয়ম বুঝুন: সহপ্রতিষ্ঠাতা, সরবরাহকারী এবং খাতভিত্তিক অনুমতি উদ্যোগের কাঠামো বদলে দেয়।
- ছোট পরীক্ষা করুন: নিজের বাজারে একটি পরিষ্কার সমস্যা নিয়ে সীমিত গ্রাহক বা উপকারভোগীর সঙ্গে কাজ করে ফল দেখুন। অন্য প্রতিষ্ঠানের আকার বা আয় নকল করার লক্ষ্য ঠিক করবেন না।
উদ্যোক্তা হওয়ার সাধারণ ধাপ জানতে নতুন উদ্যোক্তার গাইড পড়ুন। সামাজিক উদ্যোগের ধরন বুঝতে সামাজিক উদ্যোক্তা গাইড এবং নামভিত্তিক উদাহরণের বদলে অভ্যাস ও সিদ্ধান্ত নিয়ে পড়তে উদ্যোক্তাদের গল্পের ১০টি পাঠ দেখুন।
প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল উদ্যোক্তা কে?
একজনকে নির্ভরযোগ্যভাবে ‘সবচেয়ে সফল’ বলা যায় না, যতক্ষণ না সাফল্যের মাপকাঠি নির্দিষ্ট করা হয়। ব্যবসার আয়, কর্মসংস্থান, সেবার পরিধি ও সামাজিক প্রভাব ভিন্ন ভিন্ন মাপকাঠি। এই লেখার ছয়জনের মধ্যে কোনো র্যাঙ্কিং করা হয়নি।
এখানে শুধু ছয়জন কেন?
অনেক নামের তালিকায় ভুল ব্যক্তি–প্রতিষ্ঠান সম্পর্ক বা যাচাইহীন সংখ্যা ঢুকে যেতে পারে। এই সংস্করণে কেবল এমন ছয়টি উদাহরণ রাখা হয়েছে, যার প্রতিষ্ঠাতা ও উদ্যোগের পরিচয় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত উৎসে মেলে। এটি বাংলাদেশের সব সফল উদ্যোক্তার পূর্ণ তালিকা নয়।
এই উদ্যোগগুলো কি একইভাবে শুরু করা সম্ভব?
না। ওষুধ, আর্থিক সেবা, চাকরির প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক সেবার নিয়ম, পুঁজি, প্রযুক্তি ও সময় আলাদা। শেখার উপযোগী হলো সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সমাধান ছোটভাবে যাচাই করার পদ্ধতি; নির্দিষ্ট মডেল হুবহু কপি করা নয়।
তথ্য যাচাই: ২১ অক্টোবর ২০২৬। এই লেখায় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিচিতি ও ইতিহাস পাতার তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। ভবিষ্যতে পদবি, সেবা ও প্রতিষ্ঠান-তথ্য বদলাতে পারে।